আমাজন জঙ্গল রহস্য ঘেরা এক মহাবিস্ময় - বাংলা প্রযুক্তি ব্লগ

আমাজন জঙ্গল রহস্য ঘেরা এক মহাবিস্ময়

প্রযুক্তির উৎকর্ষতার স্বর্ণ সময়ে দাড়িয়েও আজো মানুষের কাছে আমাজন জঙ্গল রহস্য ঘেরা এক মহাবিস্ময় এর নাম। আমাজন নামটির মধ্যে লুকিয়ে আছে হাজারো বিস্ময় আর রহস্য।

মানুষ কুমেরু, সুমেরু, চাদ, মঙ্গলগ্রহে পৌঁছে গেলেও ভূপৃষ্ঠে অবস্থিত এই আমাজন জঙ্গল রহস্য এখনো রয়েছে মানুষের কাছে অজানা।

আমাজনিয়া, আমাজনিকা বা আমাজন যে নামেই ডাকা হোক না কেন। রহস্য আর বিস্ময়ের কোন কমতি নেই এখানে।

আমাজন জঙ্গলে এমন অনেক জায়গা রয়েছে, যেখানে কোন মানুষের পা পড়েনি।

আমাজন জঙ্গল

আমাজন জঙ্গল এর আয়তন ও অবস্থান :-

আমাজন সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক তথ্য আপনার বিস্ময়ের সীমাকে আরোও গভীরে নিয়ে যাবে। দক্ষিন আমেরিকার উত্তর দিক জুড়ে আমাজন জঙ্গল এর অবস্থান।

আমাজন নদীর ৭০ লক্ষ বর্গকিলোমিটার অববাহিকায় ৫৫ লক্ষ বর্গকিলোমিটারের আমাজন জঙ্গলের অবস্থান। যা গোটা দক্ষিন আমেরিকার মোট আয়তনের ৪০ ভাগ।

আমাজন জঙ্গল

পৃথিবীর সমস্ত রেইনফরেস্টের মোট আয়তনের অর্ধেকের সমান শুধু এই আমাজনের জঙ্গল।  আমাজনকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস।

কারন গোটা পৃথিবীর যত অক্সিজেন প্রয়োজন হয়, তার ২০ ভাগ যোগান দেয় আমাজনের জঙ্গল।

মূলত পেরুর আন্দিজ পর্বতমালা থেকে জন্ম নেওয়া আমাজন নদীর অববাহিকার দুই ধার জুড়েই রয়েছে আমাজন রহস্য ঘেরা ঘন জঙ্গল।

মোট ৯ টি দেশে বিস্তৃত এই রেইনফরেস্টের ৬০ ভাগ আছে শুধু ব্রাজিলেই। ১৩ ভাগ রয়েছে পেরুতে।

বাকীটা ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, গায়ানা, সুরিনাম, ফরাসী গায়ানা জুড়ে।

আমাজন জঙ্গল এর জীব বৈচিত্র্য ও গাছ পালা :-

এক আমাজনের জঙ্গলে রয়েছে ১৬০০০ প্রজাতির প্রায় ৩৯০ বিলিয়ন গাছ পালা।

জীব বৈচিত্রের সম্ভারে সাজানো আমাজনের জঙ্গলে রয়েছে ৪৫ লাখ প্রজাতির পোকামাকড়। 

রয়েছে ৪২৮ প্রজাতির উভচর, ১২৯৪ প্রজাতির পাখি, ৩৭৮ প্রজাতির সরীসৃপ আর ৪২৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রানী।

আর আমাজন নদীতে রয়েছে প্রায় ৩০০০ প্রজাতির মাছ। ছোট্র একটি উদাহরণ দিলে আমাজনের জীব বৈচিত্র্য সম্পর্কে বিস্ময় আরোও চরমে উঠবে।

আমাজন জঙ্গলের পেরুর অংশে একটি মাত্র গাছে ৪৩ হাজার প্রজাতির পিপড়া পাওয়া গেছে। 

আমাজন জঙ্গল

বিশ্বের প্রায় বেশিরভাগ মিঠাপানির যোগান দেয় এই নদী। যা মোট পরিমানের ২৫ শতাংশ প্রায়। 

আয়তনে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী এটি। দীর্ঘতম নদীর দিক থেকে দ্বিতীয় হলেও বিশ্বের সবচেয়ে বেশী পানি বহন করা নদী এটি।

বলা হয়ে থাকে, যেখানে আমাজন নদীর পানি সাগরে মিলিত হয় সেখানে সাগরের প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সাগরের লবনাক্ত পানিও মিঠা হয়ে যায়।

আমাজন জঙ্গল এর উপজাতী :-

এই জঙ্গলের অতীত ইতিহাস বাদ দিয়ে বর্তমান হিসাব মতে এখানে প্রায় বড় মাপের ৩০০ এর বেশী উপজাতী রয়েছে।

আমাজন উপজাতী

আর ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্টির সংখ্যা প্রায় ১০ লাখের মতো। এদের বেশীর ভাগই ব্রাজিলীয়।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এরা এখনো তাদের পুরাতন সংস্কৃতি কে ধরে রেখেছে। আধুনিক বিশ্বের ধরা ছোয়ার বাইরে এইসব উপজাতীরা বসবাস করে।

আমাজন উপজাতী

বিজ্ঞানীদের ধারনা, গননার বাহিরেও কিছু উপজাতী গোষ্ঠী রয়েছে যাদের সাথে সভ্য জগতের কোন প্রকার যোগাযোগ নেই।

আমাজনের জীব বৈচিত্র্য এবং ইকো সিস্টেম কে সচল রাখার স্বার্থে বিজ্ঞানারা এদের কে খুজে বের করার পক্ষপাতী নয়।

এতো আমাজনের পরিসংখ্যান গত ক্ষুদ্র এক অংশের বর্ননা। আসল বিস্ময়ের তো এখনো বাকী।

আমাজন জঙ্গল রহস্য উদঘাটনে অভিযান :-

বলা হয়ে থাকে, আমাজনের রুপ, রস, গন্ধে অনেকেই বিমোহিত হয়ে আমাজন জঙ্গল জয়ের স্বপ্ন দেখতে থাকে। কিন্তু রহস্যেঘেরা আমাজন তাদের কাছে রহস্য হয়েই থাকে।

যুগে যুগে যারাই আমাজন জঙ্গল রহস্যে উদঘাটনের উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছে, তারা বেশীরভাগই আর ফেরত আসতে পারেনি।

প্রকৃতপক্ষে, আমাজন ছিল বিভিন্ন সম্পদে পরিপূর্ণ। সম্পদ লাভের আশায় দফায় দফায় মানুষ এই জঙ্গলকে জয়ের নেশায় মেতে উঠেছে। যে ধারা এখনো অব্যহত আছে।

কিন্তু আমাজনের অতিরিক্ত তাপমাত্রা আর আর্দ্রতার কারনে মানুষের পক্ষে এখানে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। আরেকটা সমস্যা ছিলো খাদ্যের। 

শুনতে আশ্চর্য লাগবে যে, আমাজনের জঙ্গলে প্রায় ১৫০০ টির মতো ফল পাওয়া গেলেও এরমধ্যে খাওয়ার যোগ্য মাত্র ২০০ টির মতো ফল। সঠিক খাদ্যে চিনতে না পারলে এখানে এক মুহুর্ত টিকে থাকা অসম্ভব। 

প্রথম ব্যক্তি হিসাবে স্প্যানিশ ফান্সিসকো ডি ওরিলানা ১৬ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিশাল এক সৈন্য দল নিয়ে আমাজন জঙ্গল রহস্যে উদঘাটনের উদ্দ্যেশে যাত্রা শুরু করেন। আমাজন নদী ধরে তিনি আমাজনের শেষ পর্যন্ত পৌছান।

তার এই অভিযানের লিখিত রুপ পাওয়া যায় জারগাভাল নামের এক ধর্ম যাজকের হাতের লেখায়। যিনি ফান্সিসকো ডি ওরিলানার সফরসঙ্গী ছিলেন।

যাত্রার এক পর্যায়ে তারা অস্ত্রহাতে নারী যোদ্ধা দের প্রতিরোধের মুখে পড়েন। গ্রীক কল্প কথার স্বর্নের শহর এলডোরাডো, যা নাকি সোনায় মোড়ানো শহর।

যেখানে কি না অস্ত্রহাতে নারী যোদ্ধারা পাহারায় থাকার কথা বলা আছে। সেখানে এইসব নারীদের আমাজন বলা হয়েছে।

সেই অনুসারে ফান্সিসকো ডি ওরিলানা এই জঙ্গলের নামকরন করেন আমাজন।

আমাজন জঙ্গল রহস্য এবং এর বিস্ময়সমূহ :-

এখনও পর্যন্ত আমাজন মুখী যত অভিযান হয়েছে তার মধ্যে ওরিলানার অভিযানটিকেই একমাত্র সফল অভিযান হিসাবে অভিহিত করা হয়।

আমাজন জঙ্গল রহস্য স্বর্ণ শহর এলডোরাডো :-

ওরিলানা অবশ্য শেষ পর্যন্ত কথিত সেই স্বর্ণ নগরী এলডোরাডো খুজে পায়নি। তবে এই অভিযান থেকে বিশ্ববাসী আমাজন নিয়ে কিছু চিন্তার রসদ পেয়ে যায়।

এলডোরাডো স্বর্ণ শহর

জারগাভাল এর ভ্রমন বৃত্তান্তে আমাজনের এমন কিছু বিস্ময়কর তথ্য বের হয়ে আসে, যা রীতিমতো আশ্চর্যজনক।

সেখানে বলা হয়, যাত্রার প্রতিটি ধাপে তারা আমাজনের বাসিন্দা উপজাতীদের দ্বারা প্রতিরোধের মুখে পড়েন।

অবশ্য প্রকৃত বিষয়টি ছিল ওরিলানার সৈন্যদল খাবারের ভীষণ সংকটের দরুন উপজাতীদের গ্রামে আক্রমন করতো শুধু খাবারের আশায়।

এভাবে তারা উপজাতী দের সাথে যুদ্ধ করতে করতে আমাজন জঙ্গল রহস্য উদঘাটনের পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। 

জারগাভাল বলছেন, প্রতিটি যুদ্ধে এতো বিপুল পরিমান উপজাতী অংশ নিয়েছিল যেটা রীতিমতো আশ্চর্যজনক।

শুধুমাত্র গুটি কয়েক আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের বদৌলতে উপজাতীদের পরাজিত করে ওরিলানার বাহিনী সামনে এগুতে থাকে।

পরবর্তীতে বিজ্ঞ ব্যক্তিরা ওই সমসাময়িক আমাজনের অরন্যে উপজাতি দের সংখ্যা নিয়ে জারগাভাল এর লেখা তথ্যকে মেনে নিতে পারেননি।

যার সুনির্দিষ্ট কারন হলো, এমনিতেই ভয়ানক এই অরন্যে এত লোকের খাদ্যের সংস্থান হওয়া অসম্ভব ছিলো। 

কিন্তু পরবর্তীতে গভীর গবেষণায় বেরিয়ে আসে নানান চমকপ্রদ তথ্য। যা রীতিমতো মানুষকে চমকে দেয়।

টেরা পেট্রা বা কালো মাটি :- 

প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজের মাধ্যমে বিশ্ববাসী জানতে পারে যে, নামে এটি রেইনফরেষ্ট হলেও প্রায় ৩ হাজার বছর আগে এটি মানুষের হাতে তৈরি একটি ফল বাগান।টেরা পেট্রা

আমাজনের ৬/৭ ফুট গভীরে এক ধরনের কালো মাটি (টেরা পেট্রা) পাওয়া গেছে। যার উর্বরা শক্তি,  কার্যকারিতা এবং দীর্ঘস্থায়িত্বের কারনে আধুনিক কালের কমোষ্ট এর ধারনাকে হার মানিয়েছে।

কাঠ কয়লা, মাছের কাটা, হাড়ের গুরা আর নাম না জানা নানা উপাদানে তৈরি এই কালো মাটির রহস্যে বিজ্ঞানীরা এখনো ঠাউর করতে পারেনি।

ধারনা করা হচ্ছে, যদি এই কালো মাটির রসায়ন বিজ্ঞানিরা জানতে পারে তবে আজকের পৃথিবী কে কখনই খাদ্য সমস্যায় ভুগতে হবে না।

বলা হচ্ছে, উপজাতীরা নিজেদের বানানো এই কালো মাটির বাগান থেকে নিজেদের খাদ্যের পূর্ন চাহিদা মিটিয়ে নিতো।

এটা তারা এমন এক পর্যায়ে নিয়ে এসেছিলো যে, সামান্যে পরিশ্রমের দ্বারা খাদ্যের সংস্থান করে তারা বাকী সময়টা শিল্প, সংস্কৃতির চর্চা করতো। আমাজনের জঙ্গলের কিছু অংশে খনন কার্যের মাধ্যেমে এইসব সত্য আজ প্রমানিত।  

 যে মানুষেরা এটা বানিয়েছিল তারা রীতিমতো সভ্য এবং বুদ্ধিমান মানুষ ছিল। ধারনা করা হচ্ছে, সেইসময় এমন কিছু প্রযুক্তির ব্যবহার ছিল, যেগুলো আধুনিক কালের শেষ মুহুর্তে আবিস্কৃত হয়েছে। সেই সময়ে এই সব প্রযুক্তি কিভাবে বা কোথা থেকে পেল এটাইও একটা বড় বিস্ময়। 

বৃত্ত এবং চতুর্ভুজাকার স্থাপত্য :-

স্যাটালাইট থেকে পাওয়া ছবি এনালাইজ করে বিজ্ঞানিরা আমাজনের বুকে যে গোলাকার, চারকোনা আকারের স্থাপনার কথা বলছেন, সেগুলো তৈরি করতে অগাধ জ্যামিতিক জ্ঞান এর দরকার হয়েছিল। 

আমাজন জঙ্গল

ওরিলানার সফরসঙ্গী জারগাভাল একই কথা বলেছিলেন যে, উপজাতীদের গ্রাম গুলো গাছের গুড়ি দিয়ে ঘেরা গোলাকার বা চারকোনা ছিলো। আর প্রত্যেকটি গ্রাম নেটওয়ার্কের মধ্যে যুক্ত ছিল।

অবশ্য, আমাজন নিয়ে বিশদভাবে জানার কিছু আগে জারগাভাল এর লেখা বিবরন গুলো নিয়ে হালের কিছু বিজ্ঞানীদের মধ্যে দ্বিধা দ্বন্দ ছিলো।

কিন্তু দু একটি বিষয় ছাড়া জারগাভাল এর বিবরন গুলো ধীরে ধীরে সত্য বলে প্রমানিত হচ্ছে। 

ফুটন্ত নদী এবং মানুষ খেকো সাপ ও গাছ :-

জারগাভালের লেখায় ফুটন্ত নদীর কথা ছিলো, বিশাল বিশাল মানুষ খেকো সাপ আর গাছের কথা ছিল।

সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাজনের জঙ্গলে এমন নদী আছে যা শুধু ফুটন্ত বললে ভুল হবে গরমে রীতিমতো টগবগ করে ফুটতে থাকে।

আমাজনের বিশাল বিশাল বয়া কানেক্টর আর এনাকোন্ডা সাপের কথা তো আজ আর কারোও অজানা নয়।

মাংসাশী পিরানহা :-

আমাজনের আরেক বিস্ময় হলো মাংসাশী পিরানহা মাছ। আমাজন নদীতে এরা ঝাকে ঝাকে ঘুরে বেড়ায় শিকারের আশায়।

পিরানহা

আকারে ছোট হলেও দলবদ্ধতার কারনে যেকোন বড় শিকারকেও এরা নিমিষেই খেয়ে ফেলতো। 

আমাজন নদী :-

স্বয়ং আমাজন নদীটাই এখনো পর্যন্ত মানুষের কাছে একটা বড় বিস্ময়। কোথাও কোথাও এই নদীটি ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত চওড়া।

আমাজন নদী মোহনা

আর আমাজন নদীর পানি যেখানে সমুদ্রে মিলিত হয়েছে সেখানে নদীর মুখ এতোই চওড়া যে তার সামনে পড়ে মাজারিও নামের একটি বড় আকারের দ্বীপ তলিয়ে যায়। যার আয়তন বর্তমান সুইজারল্যান্ড এর সমান।

আমাজন জঙ্গল

এই নদী প্রতি সেকেন্ডে ৪.২ মিলিয়ন ঘনফুট পানি সাগরে ফেলে, বর্ষাকালে যা ৭ মিলিয়ন ঘনফুটে গিয়ে দাড়ায়।

দিনে প্রায় ১৮ হাজার কিউসেক পানি আমাজন নদী থেকে আটলান্টিক সাগরে মেশে। 

আশ্চর্যের বিষয় হলো,বিস্ময়কর ভাবে এই নদীর গতিপথ উল্টে গেছে। একটা সময় এই নদীর প্রবাহ ছিল ঠিক এখনকার বিপরীত দিকে। যেটা এখন পুর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হচ্ছে।

অতি সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা আমাজন নদীর তলদেশে আরেকটি প্রবাহমান নদীর খোজ পেয়েছে, যা বর্তমান আমাজন নদীর দিগুন প্রায়।

 

2 thoughts on “আমাজন জঙ্গল রহস্য ঘেরা এক মহাবিস্ময়

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।